ই-পেপার

মৌখিক তালাক দিলেই দায় শেষ নয়, সন্তানের অধিকার স্বাধীন: হাইকোর্ট

প্রকাশ : ১৬ জুলাই ২০২৬ | প্রিন্ট সংস্করণ |

মৌখিক বা আইনগতভাবে অপ্রমাণিত তালাকের দাবি তুলে স্ত্রীর দেনমোহর ও ভরণপোষণের দায় এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট।

একইসঙ্গে আদালত স্পষ্ট জানিয়েছেন, বাবা-মায়ের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক থাকুক বা না থাকুক, নাবালক সন্তানের ভরণপোষণ পাওয়া একটি ‘স্বাধীন ও স্বতন্ত্র’ আইনি অধিকার।

পারিবারিক আদালতের একটি ডিক্রি জারির (বাস্তবায়ন) কার্যক্রম স্থগিত চেয়ে স্বামীর করা এক রিভিশন আবেদন খারিজ করে বিচারপতি আবদুর রহমানের একক হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেন। গত ২২ জুন হাইকোর্ট এ রায় ঘোষণা করেন।

বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশিত হয়েছে। রায়ে মামলাটির খরচ মওকুফ করে দেওয়া হয়েছে।

তবে স্বামীকে অবিলম্বে তার স্ত্রী ও নাবালিকা কন্যার বকেয়া দেনমোহর ও যাবতীয় বকেয়া ভরণপোষণ পরিশোধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আর্থিক অসচ্ছলতা প্রমাণ করতে পারলে বিচারিক আদালত তাকে কিস্তিতে টাকা পরিশোধের সুযোগ দিতে পারবেন বলেও রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে।

আদালতে স্বামীর (দরখাস্তকারী) পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মোহাম্মদ শহীদুল ইসলাম। অন্যদিকে সুপ্রিম কোর্ট লিগ্যাল এইড কমিটির মাধ্যমে নিযুক্ত হয়ে স্ত্রীর (অপর পক্ষ) পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী ইশরাত হাসান, সঙ্গে ছিলেন তানজিলা রহমান জুঁই ও ইফাত হাসান শাম্মী।

মামলার নথির তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর বাগেরহাটের শেখ নজরুল ইসলামের সঙ্গে হালিমা খাতুনের বিয়ে হয়। পরে ২ লাখ টাকা যৌতুক দাবির জেরে হালিমা বাবার বাড়ি চলে যান এবং ২০১৫ সালে তাদের একটি কন্যা সন্তানের জন্ম হয়।

নজরুল ইসলাম স্ত্রী-সন্তানের খোঁজখবর ও ভরণপোষণ না দেওয়ায় হালিমা খাতুন পারিবারিক আদালতে মামলা করেন। ওই মামলায় স্বামী দাবি করেন, তিনি ২০১৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর স্ত্রীকে চূড়ান্ত তালাক দিয়েছেন। কিন্তু বিচারিক আদালতে তিনি সেই তালাকের বৈধতা প্রমাণ করতে ব্যর্থ হন। এরপর আদালত স্ত্রীর পক্ষে চূড়ান্ত ডিক্রি দেন।

নজরুল ইসলাম এই রায়ের বিরুদ্ধে জেলা জজ আদালত এবং পরে হাইকোর্টে গেলে উভয় স্থানেই নিম্ন আদালতের রায় বহাল থাকে।

এরপর নতুন কৌশল নেন নজরুল। তিনি তালাক কার্যকর হয়েছে মর্মে ঘোষণা চেয়ে ২০২২ সালে বাগেরহাটের সহকারী জজ আদালতে একটি দেওয়ানি মামলা করেন। অন্যদিকে স্ত্রী হালিমা খাতুন তার বকেয়া টাকা আদায়ে ২০১৮ সালের ডিক্রি জারির মামলাটি চালিয়ে যান। নতুন মামলার অজুহাত দেখিয়ে স্বামী ডিক্রি জারির মামলাটি স্থগিতের আবেদন করেন। নিম্ন আদালত ও আপিল আদালত সেই স্থগিতাদেশ নাকচ করলে তিনি হাইকোর্টে বর্তমান রিভিশন মামলাটি দায়ের করেন।

হাইকোর্টের রায়ের পূর্ণাঙ্গ পর্যবেক্ষণ

হাইকোর্ট এই মামলায় আইনি বিষয়গুলো নিয়ে বিশদ পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন। পারিবারিক আদালতের একচ্ছত্র এখতিয়ার: হাইকোর্ট বলেছেন, ১৯৮৫ সালের পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশের ৫ ধারা অনুযায়ী বিবাহ, তালাক, দেনমোহর, ভরণপোষণ এবং সন্তানদের অভিভাবকত্বের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার একচ্ছত্র এখতিয়ার কেবল পারিবারিক আদালতের। অন্য কোনো আদালত এসব বিষয়ের বিচার করতে পারে না। তাই কথিত তালাকের বৈধতা বা কার্যকারিতার বিষয়টির নিষ্পত্তি কেবল পারিবারিক আদালতকেই করতে হবে।

জারি (এক্সিকিউশন) আদালতের সীমাবদ্ধতা: ১৯৮৫ সালের আইনের ১৬(৪) ধারা উল্লেখ করে হাইকোর্ট বলেন, ডিক্রি জারি বা বাস্তবায়নকারী আদালতের এখতিয়ার কঠোরভাবে প্রশাসনিক। ডিক্রিটি যেভাবে আছে, তা সেভাবেই বাস্তবায়ন করা তাদের কাজ। ডিক্রির বাইরে যাওয়ার কোনো ক্ষমতা এই আদালতের নেই। ডিক্রির মাধ্যমে চূড়ান্ত হওয়া কোনো বিষয় পুনরায় উন্মোচন করা কিংবা তালাক বৈধ কি না, তা নিয়ে নতুন বিতর্কের বিচার করার এখতিয়ার জারি আদালতের নেই। অন্য কোনো আদালতে সমজাতীয় মামলা বিচারাধীন থাকার অজুহাতে জারি কার্যক্রম স্থগিত রাখারও কোনো সুযোগ নেই।

সন্তানের ভরণপোষণ একটি ‘স্বাধীন অধিকার’: আদালত তার পর্যবেক্ষণে স্পষ্ট করেছেন, নাবালক সন্তানের ভরণপোষণ পাওয়ার অধিকার একটি স্বাধীন সংবিধিবদ্ধ এবং আইনি অধিকার। পিতা-মাতার মধ্যে দাম্পত্য বিরোধ আছে কি নেই, তার ওপর এই অধিকার নির্ভর করে না। তালাকের বৈধতা নিয়ে যত বিতর্কই থাকুক না কেন, পিতাকে তার সন্তানের ভরণপোষণ দিতেই হবে। বিবাহ বিচ্ছেদের অমীমাংসিত বিরোধের আশ্রয় নিয়ে নাবালিকা কন্যার ভরণপোষণ আটকে রাখার কোনো সুযোগ নেই।

অপ্রমাণিত তালাকের কোনো আইনি ভিত্তি নেই: হাইকোর্ট বলেন, স্বামী সবসময় দাবি করে এসেছেন যে তিনি তালাক দিয়েছেন। কিন্তু বিচারিক আদালত, আপিল আদালত এমনকি হাইকোর্টের কাছেও তিনি তা প্রমাণ করতে পারেননি। বিচারিক স্বীকৃতি না থাকায় এটি শুধুই একটি ‘সাধারণ বক্তব্য’, যার কোনো আইনি ভিত্তি নেই। ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৭ ধারার বিধান (চেয়ারম্যানকে নোটিশ, সালিশি কাউন্সিল ইত্যাদি) কঠোরভাবে পালন ছাড়া তালাক কার্যকর হয় না। অপ্রমাণিত বা অকার্যকর তালাক বৈবাহিক সম্পর্ককে বিলুপ্ত করতে পারে না।

নতুন মামলা বনাম চূড়ান্ত ডিক্রি: আদালত বলেছেন, দেশের প্রতিটি নাগরিকের উপযুক্ত আদালতে প্রতিকার চাওয়ার অধিকার রয়েছে। তাই স্বামীর নতুন দেওয়ানি মামলা দায়ের স্বতঃস্ফূর্তভাবে বেআইনি নয়। কিন্তু এ ধরনের একটি মামলা বিচারাধীন থাকার কারণে এমন কোনো ডিক্রি স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্থগিত, বাতিল বা অকার্যকর হয়ে যায় না, যা আগেই চূড়ান্ততা পেয়েছে।

হাইকোর্টের পূর্বের আদেশ অমান্যের সুযোগ নেই: রায়ে বলা হয়, স্বামী ২০১৯ সালে হাইকোর্টে রিভিশন মামলা করে হেরে যাওয়ার পর আপিল বিভাগে যাননি। ফলে হাইকোর্টের ওই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত ও বাধ্যতামূলক হয়ে গেছে। কোনো সমান্তরাল বা আনুষঙ্গিক কার্যধারার (নতুন মামলা) মাধ্যমে ওই রায়ের আইনি ফলাফল এড়ানোর কোনো সুযোগ তাকে দেওয়া যাবে না।

নতুন তালাক দিতে বাধা নেই, তবে বকেয়া মেটাতে হবে

আদালত বলেছেন, স্বামী যদি মনে করেন বৈবাহিক সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা অসম্ভব, তবে তিনি আইন মেনে নতুন করে বিবাহ বিচ্ছেদের প্রক্রিয়া শুরু করতে পারেন। আগের অকার্যকর তালাক এক্ষেত্রে বাধা হবে না। কিন্তু নতুন করে আইনি প্রতিকার চাওয়ার সুযোগ থাকার অর্থ এই নয় যে, বলবৎযোগ্য ডিক্রির অধীনে থাকা পূর্বের দায়-দায়িত্ব (স্ত্রী-সন্তানের বকেয়া দেনমোহর ও ভরণপোষণ) পালনের হাত থেকে তিনি বেঁচে যাবেন।

রায়ের বিষয়ে স্ত্রীর পক্ষের আইনজীবী ইশরাত হাসান সাংবাদিকদের বলেন, ‘এটি আদালতের একটি যুগান্তকারী রায়। আদালত স্পষ্ট করেছেন যে, নাবালক সন্তানের ভরণপোষণ একটি স্বাধীন অধিকার (ইন্ডিপেনডেন্ট রাইট)। নাবালক সন্তান যার কাছেই থাকুক, যেভাবেই থাকুক, বাবা-মায়ের সম্পর্ক থাকুক বা না থাকুক— পিতাকে সবসময় তার সন্তানের ভরণপোষণ দিয়ে যেতে হবে।’

অপ্রমাণিত তালাকের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘স্বামী দাবি করেছিলেন তিনি তালাক দিয়েছেন, কিন্তু আদালতে তা প্রমাণ করতে পারেননি। শুধুমাত্র মৌখিকভাবে তালাক দিয়েছেন বললেই হবে না, তালাকটি আইনগতভাবে প্রমাণিত হতে হবে। যতক্ষণ এটি প্রমাণিত না হচ্ছে, স্ত্রীর ভরণপোষণের দায় এড়ানোর কোনো সুযোগ স্বামীর নেই।’

আইনজীবী ইশরাত হাসান আরও বলেন, ‘পিটিশনার (স্বামী) যদি নতুন করে আবার তালাক দিতে চান, সেটিতে কোনো বাধা নেই। তিনি নতুন করে ডিভোর্স দিতে পারবেন। তবে এতদিন ধরে তার স্ত্রীর ও সন্তানের প্রাপ্য যে ভরণপোষণ বকেয়া হয়েছে, সেটি তাকে পরিশোধ করতেই হবে। হাইকোর্ট গত ১০ বছরের যত বকেয়া আছে, সব পরিশোধের নির্দেশ দিয়েছেন।’

সব খবর

আর্কাইভ

July 2026
M T W T F S S
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
2728293031