জাতীয়

দেশজুড়ে গ্যাস সংকট, শিল্প-পরিবহন-আবাসিকে চরম দুর্ভোগ

দেশজুড়ে গ্যাস সংকট, শিল্প-পরিবহন-আবাসিকে চরম দুর্ভোগ

রাজধানীর বিভিন্ন সিএনজি স্টেশনে এখন আর গাড়ির লাইন শুধু কয়েকশ মিটার নয়, কোথাও কোথাও তা সড়কের অনেকটা অংশজুড়ে বিস্তৃত। ভোররাত থেকে অপেক্ষা করেও গ্যাস মিলছে না অনেক চালকের। অন্যদিকে অসংখ্য বাসাবাড়িতে দিনের পর দিন চুলা জ্বলছে না। শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন কমে যাওয়ায় রফতানি আদেশ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে উদ্যোক্তাদের। সব মিলিয়ে মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটি দেশের জ্বালানি ব্যবস্থাকে বড় ধরনের চাপে ফেলেছে।

সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, টার্মিনালের ত্রুটির কারণে জাতীয় গ্যাস গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সরবরাহ কমে গেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে আবাসিক, শিল্প, বিদ্যুৎ, বাণিজ্যিক ও সিএনজি খাতে। যদিও সরকার এটিকে সাময়িক সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করে দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দিচ্ছে, তবে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি কেবল একটি যান্ত্রিক ত্রুটির ঘটনা নয়, বরং দেশের জ্বালানি ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতাও সামনে নিয়ে এসেছে।

রান্নাঘরে চুলা নিভে, রাস্তায় গাড়ির চাকা থমকে

রাজধানীর বহু এলাকায় দিনের বেশির ভাগ সময় গ্যাসের চাপ এতটাই কম যে রান্না করা সম্ভব হচ্ছে না। অনেক পরিবার বৈদ্যুতিক চুলা কিংবা এলপিজির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এতে মাসিক ব্যয়ও বেড়েছে।

মুগদা এলাকার বাসিন্দা নুরুন্নবী বলেন, সপ্তাহজুড়ে গ্যাস না থাকায় বাইরে থেকে খাবার কিনেই চলতে হচ্ছে। রাত গভীরেও পর্যাপ্ত চাপ পাওয়া যায় না।

যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা মায়মুনা বেগম জানান, নিয়মিত ইনডাকশন চুলায় রান্না করতে হচ্ছে। ফলে গ্যাসের বিলের পাশাপাশি বিদ্যুতের বাড়তি বিলও গুনতে হচ্ছে।

একই চিত্র নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদী ও টাঙ্গাইল, সাভারসহ তিতাস গ্যাসের আওতাধীন বিভিন্ন এলাকাতেও দেখা যাচ্ছে।

সিএনজি স্টেশনে রাতভর অপেক্ষা

রাজধানীর অধিকাংশ সিএনজি ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে। কোথাও কয়েক ঘণ্টা পর অল্প সময়ের জন্য গ্যাস আসে, আবার কোথাও পুরো স্টেশনই বন্ধ রাখতে হচ্ছে।

বাইক চালক রায়হান আজাদ বলেন, আগে দিনে দেড় থেকে দুই হাজার টাকা আয় হতো। এখন দিনের বড় অংশই পাম্পে দাঁড়িয়ে কাটছে। ফলে আয় কমে গেছে, অথচ গাড়ির ভাড়া ও অন্যান্য খরচ ঠিকই দিতে হচ্ছে।

হায়েজ গাড়ীর চালক সাগর আহমেদ জানান, ভোররাতে লাইনে দাঁড়িয়েও দুপুর পর্যন্ত গ্যাস পাননি। প্রতিদিনের নির্দিষ্ট খরচ থাকলেও আয় প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।

বাংলাদেশ সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভার্সন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব ফারহান নূর বলেন, গ্রিডে পর্যাপ্ত গ্যাস না থাকায় স্টেশন মালিকদের কিছুই করার নেই। অনেক সময় মেশিন চালিয়েও পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে গ্রাহকের পাশাপাশি স্টেশন মালিকদেরও আর্থিক ক্ষতি বাড়ছে।

পরিবহন খাতে বাড়ছে সংকট

গ্যাসের অভাবে রাজধানীতে সিএনজি অটোরিকশা ও গ্যাসচালিত বাসের সংখ্যা কমে গেছে। ফলে যাত্রীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি ভাড়া গুনে বিকল্প পরিবহন ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।

পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি গাড়ি আগে যে সময় যাত্রী পরিবহনে ব্যয় করত, এখন তার বড় অংশ চলে যাচ্ছে গ্যাস সংগ্রহে। ফলে সড়কে যানবাহনের উপস্থিতিও কমে যাচ্ছে।

ডেমরার বাসিন্দা বলেন, আমার বাবাকে নিয়ে মিরপুরে ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলাম অনেক কষ্টে। সিএনজি পাচ্ছিলাম না। ভাড়াও বেশি। আসার সময় দেড় ঘণ্টা অপেক্ষা করে একটা সিএনজি পেলাম। ভাড়া চায় দ্বিগুন। সড়কে সিএনজির সংখ্যা কম। যেগুলো আছে চাকরা বলছেন, গাড়ীতে পর্যাপ্ত গ্যাস নেই। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে গ্যাস নিতে হয়। এজন্য ভাড়া বেশি।

এক সিএনজি চালক বলেন, ৩ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে ১৫০ টাকার গ্যাস পেয়েছি। এই গ্যাস দিয়ে তো আর সারাদিন গাড়ি চালানো যাবে না। 

শিল্পাঞ্চলে উৎপাদনে ধাক্কা

গ্যাস সংকট সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি করেছে শিল্প খাতে। গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া, নরসিংদী ও চট্টগ্রামের বহু কারখানায় প্রয়োজনীয় গ্যাসচাপ না থাকায় উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

শিল্প উদ্যোক্তারা জানান, অনেক কারখানায় প্রয়োজনীয় ১০ থেকে ১৫ পিএসআই চাপের পরিবর্তে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ১ থেকে ৩ পিএসআই। এতে বয়লার ও জেনারেটর স্বাভাবিকভাবে চালানো যাচ্ছে না। কেউ কেউ বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করলেও উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে।

কিছু রপ্তানিমুখী কারখানায় উৎপাদন অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে। এতে সময়মতো বিদেশি ক্রেতার কাছে পণ্য সরবরাহ নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

কেন তৈরি হলো এই সংকট?
 
জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউতে কারিগরি ত্রুটি দেখা দেওয়ায় জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ কমে যায়। ওই টার্মিনালে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পুনরায় গ্যাসে রূপান্তর করে জাতীয় পাইপলাইনে সরবরাহ করা হয়।

স্থানীয় প্রকৌশলীরা ত্রুটির উৎস শনাক্ত করতে না পারায় বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় মেরামতের কাজ চলছে।

পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, দেশি ও বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত টেকনিক্যাল টিম টার্মিনালটি দ্রুত চালু করার জন্য নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করছে।

সরকার যা বলছে

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, এটি সাময়িক সমস্যা। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে এবং অচিরেই গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হবে।

জ্বালানি বিভাগের যুগ্ম সচিব (অপারেশন) মনির হোসেন চৌধুরীও জানিয়েছেন, কারিগরি ত্রুটি মেরামতের কাজ দ্রুত এগোচ্ছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত তাদের আওতাধীন এলাকায় গ্যাসের স্বল্পচাপ অব্যাহত থাকতে পারে।

শুধু টার্মিনাল চালু হলেই কি সংকট শেষ?

তিতাস গ্যাসের অপারেশন বিভাগের মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী কাজী মোহাম্মদ সাইদুল হাসানের মতে, বর্তমান সংকটের একটি অংশ টার্মিনালের ত্রুটির কারণে হলেও মূল সমস্যা আরও গভীরে।

তিনি বলেন, তিতাসের দৈনিক চাহিদা প্রায় ১ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু স্বাভাবিক সময়েও সরবরাহ পাওয়া যায় প্রায় ১ হাজার ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এর বড় একটি অংশ বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সার কারখানায় চলে যাওয়ায় অন্যান্য খাতে ঘাটতি থেকেই যায়। ফলে এফএসআরইউ সচল হলেও গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান পুরোপুরি দূর হবে না।

এদিকে পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের (এফএসআরইউ) কারিগরি ত্রুটি দ্রুত মেরামত করে পুনরায় চালু করতে দেশি ও বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত টেকনিক্যাল টিম নিরলসভাবে কাজ করছে।

সংস্থাটি জানায়, এফএসআরইউর কারিগরি ত্রুটি দূর করতে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী ও বিশেষজ্ঞরা সার্বক্ষণিক কাজ করছেন। মেরামত কার্যক্রম শেষ হলেই টার্মিনালটি পুনরায় চালু করা হবে।

পেট্রোবাংলা আরও জানায়, এ বিষয়ে নতুন কোনো অগ্রগতি হলে তা জানিয়ে দেওয়া হবে। একই সঙ্গে সাময়িক এই কারিগরি সমস্যার কারণে গ্যাস সরবরাহে সৃষ্ট ভোগান্তির জন্য গ্রাহকদের কাছে আন্তরিক দুঃখ প্রকাশ করেছে সংস্থাটি।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন মনে করেন, প্রতি বছর কোনো না কোনো কারণে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। সমুদ্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।

তার মতে, অন্তত ১৫ দিনের এলএনজি মজুত রাখার সক্ষমতা গড়ে তোলা, স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ এবং দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে বিনিয়োগ বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। অন্যথায় একই ধরনের সংকট ভবিষ্যতেও ফিরে আসতে পারে।

সমাধানের অপেক্ষায় দেশ

বর্তমান সংকট সাময়িক হলেও এর প্রভাব বিস্তৃত। একটি টার্মিনালের যান্ত্রিক ত্রুটি কীভাবে রাজধানীর রান্নাঘর থেকে শুরু করে শিল্পাঞ্চল, গণপরিবহন ও অর্থনীতির বিভিন্ন খাতকে একসঙ্গে বিপর্যস্ত করতে পারে, সেটিই এবার স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

মেরামত শেষে গ্যাস সরবরাহ কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার আশা করা হলেও বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে সরবরাহ ব্যবস্থার বহুমুখীকরণ, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বৃদ্ধি এবং পর্যাপ্ত এলএনজি সংরক্ষণ সক্ষমতা তৈরি না হলে এমন সংকট বারবার ফিরে আসবে। তাই তাৎক্ষণিক সমাধানের পাশাপাশি টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

Leave a Comment